এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর অবশেষে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হলো টেকনাফ স্থলবন্দরে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকা থেকে কাঠবোঝাই একটি ট্রলার বন্দরে এসে পৌঁছেছে, যা দীর্ঘদিন স্থবির থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর সম্ভাবনাকে জোরালো করেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও বন্দর-নির্ভর মানুষের মাঝে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে।
শুক্রবার (১ মে) দুপুর প্রায় দেড়টার দিকে ট্রলারটি বন্দরে ভিড়লে দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে। এতদিন সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থাকায় বন্দর এলাকায় কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শ্রমিকরা ছিলেন কর্মহীন, ব্যবসায়ীরা পড়েছিলেন অনিশ্চয়তায়। তবে হঠাৎ এই ট্রলারের আগমনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে টেকনাফ বন্দর।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, প্রথম চালানেই এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঠ। মোট ৯৬৩ পিস কাঠের মধ্যে রয়েছে ৫২০ পিস চম্পাফুল এবং ৪৪৩ পিস গর্জন কাঠ। এসব কাঠ দ্রুত খালাসের কাজ শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এটি নিয়মিত বাণিজ্যের সূচনা হতে পারে।
বন্দর পরিদর্শনে এসে স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বৈধ পথে সীমান্ত বাণিজ্য সচল থাকলে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব অর্জন করতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তিনি আরও জানান, সরকার ইতোমধ্যে বন্দর সচল রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরা এই ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা বন্ধ থাকায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকেই ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। এখন আবার বাণিজ্য শুরু হলে তারা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও করতে পারবেন।
এর আগে গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা বন্দরটি পরিদর্শন করে দ্রুত কার্যক্রম চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতেই এই চালানটিকে অনেকেই ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্ত বাণিজ্য যদি নিয়মিতভাবে চালু থাকে, তাহলে টেকনাফসহ আশপাশের অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ছোট-বড় ব্যবসা, পরিবহন খাত, শ্রমবাজার—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে যারা সরাসরি বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরবে।
উল্লেখ্য, প্রায় দেড় বছর ধরে চলমান সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা অস্থির হয়ে পড়ে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে অর্থ দাবিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সীমান্ত বাণিজ্য কার্যত স্থগিত করে দেয়। ফলে শতাধিক আমদানিকারক-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন এবং টেকনাফ বন্দর কার্যত অচল হয়ে যায়।
বর্তমানে এই কাঠবোঝাই ট্রলারের আগমনকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এটি কেবল একটি চালান নয়, বরং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের সূচনা।