বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ইস্যু নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৬ জুন) দেশের একাধিক সীমান্ত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় জনগণের সতর্ক অবস্থানের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সীমান্তে পুশইনের জন্য আনা প্রায় একশ জনকে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বিএসএফ।
সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরের হিলি, মেহেরপুর এবং লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এসব এলাকায় বিজিবি সদস্যরা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্তে নজরদারিতে সহযোগিতা করেন। ফলে পুশইনের বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা শুরুতেই প্রতিহত করা সম্ভব হয়।
মেহেরপুর জেলার তেঁতুলবাড়িয়া হাটপাড়া সীমান্ত এলাকায় ভোরের দিকে কয়েকজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়রা বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্রুত বিজিবিকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সীমান্তে অবস্থান নেন। তাদের উপস্থিতি ও কঠোর অবস্থানের কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্তেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে একদল মানুষকে বাংলাদেশের দিকে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষ ঘটনাটির প্রতিবাদ জানায় এবং সীমান্তে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধের দাবি তোলে। যদিও প্রাথমিকভাবে বিএসএফ বিষয়টি অস্বীকার করে বলে জানা গেছে।
দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের ঘাসুড়িয়া এলাকাতেও কয়েকজনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালানো হয়। তবে বিজিবির টহল ও নজরদারির কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
লালমনিরহাট জেলার চারটি সীমান্ত পয়েন্টেও পুশইনের চেষ্টা করা হয়। বিজিবি সদস্যরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে সীমান্তে আনা ব্যক্তিদের আবারও ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে এবং যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এর আগের দিন নওগাঁর সাপাহার সীমান্তেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। সেখানে একদল মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি বাধা দেয়। দীর্ঘ সময় আলোচনার পর রাতের দিকে তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অন্যদিকে পঞ্চগড় সীমান্তে কিছু ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মাঝামাঝি শূন্যরেখা এলাকায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে এখনো দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে একাধিক দফায় পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ পক্ষ সীমান্তে একতরফাভাবে মানুষ পাঠানোর অভিযোগ তুলে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশইন কিংবা যেকোনো ধরনের সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় আরও জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে বান্দরবানের দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ করা খুমি সম্প্রদায়ের ৪৭ জনকে বিজিবি হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সব ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনায় একই নীতি অনুসরণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও কার্যকর সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানবাধিকার বিবেচনায় রেখে সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান করা জরুরি।