বর্তমান বৈশ্বিক চাকরির বাজারে প্রবীণ পেশাজীবীদের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং কর্মজীবনের সাফল্য থাকার পরও অনেক প্রবীণ চাকরিপ্রার্থী নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিভিন্ন গবেষণা ও শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের মধ্যে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা ৫ শতাংশেরও কম। বিষয়টি নিয়ে শ্রমবাজার বিশ্লেষক, মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ এবং প্রবীণ কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে যেখানে তরুণ কর্মীদের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কোম্পানিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বয়সভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চাকরির বিজ্ঞাপন, সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া এবং নিয়োগের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান পরোক্ষভাবে কম বয়সী কর্মীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে “ইয়াং অ্যান্ড এনার্জেটিক”, “ফাস্ট-পেসড ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট”, “ডিজিটাল নেটিভ”, “ডায়নামিক টিম” কিংবা “নতুন প্রজন্মের চিন্তাধারা” ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব শব্দ অনেক সময় পরোক্ষভাবে তরুণদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। ফলে বয়সে বড় এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চাকরিপ্রার্থীরা আবেদন করতেই অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। অনেক প্রবীণ পেশাজীবী অভিযোগ করেন, চাকরির সাক্ষাৎকারে তাদের অভিজ্ঞতার চেয়ে বয়সকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক সময় সরাসরি না বললেও প্রশ্নের ধরন কিংবা আচরণে বোঝানো হয় যে প্রতিষ্ঠানটি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কাউকে খুঁজছে। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাকরির ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল দক্ষতার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করছে তরুণ কর্মীরাই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন। এই ধারণা থেকেই প্রবীণ কর্মীদের অনেক সময় পিছিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধারণা সবসময় সঠিক নয়। কারণ বহু প্রবীণ পেশাজীবী নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি শিখছেন এবং নিজেদের দক্ষতা হালনাগাদ করছেন। শুধু বয়সের কারণে তাদের অযোগ্য মনে করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একসময় চাকরির বাজারে অভিজ্ঞতা ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ। বহু বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকা মানেই নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ভরযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার বদলে “কম বয়স” একটি অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করে তরুণ কর্মীরা তুলনামূলক কম বেতনে কাজ করতে রাজি হন এবং দীর্ঘ সময় কাজের চাপ সামলাতে পারেন। এছাড়া নতুন প্রযুক্তি গ্রহণেও তারা দ্রুত। ফলে কোম্পানিগুলো খরচ কমানো ও দ্রুত উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্য থেকে তরুণ কর্মীদের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। অভিজ্ঞ কর্মীদের বাদ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা হারাতে পারে। জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা, টিম পরিচালনা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভিজ্ঞ কর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। অনেক দেশে বয়সভিত্তিক বৈষম্য রোধে আইন থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। কর্মক্ষেত্রে বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এখনও বিদ্যমান। অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করে প্রবীণ কর্মীরা পরিবর্তনের সঙ্গে ধীরে মানিয়ে নেন বা তাদের প্রশিক্ষণ ব্যয় বেশি। কিন্তু এসব ধারণার পক্ষে সবসময় বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় না। শ্রম অধিকারকর্মীরা বলছেন, বয়সভিত্তিক বৈষম্য শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। কারণ এতে দক্ষ জনশক্তির একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্র থেকে ধীরে ধীরে ছিটকে পড়ছে। এতে ব্যক্তি যেমন আর্থিক সংকটে পড়েন, তেমনি অর্থনীতিও অভিজ্ঞ কর্মীর অবদান থেকে বঞ্চিত হয়। চাকরি হারানো বা নতুন চাকরি না পাওয়ার কারণে অনেক প্রবীণ পেশাজীবী মানসিক চাপে ভুগছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দক্ষতা বা অবদানকে আর মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও উদ্বেগজনক। কারণ কর্মজীবনের শেষভাগে এসে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। চাকরিপ্রার্থীর বয়স নয়, তার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রবীণ কর্মীদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, কর্মক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বৈচিত্র্য বজায় থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হয়। তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজ করলে উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিশীলতা দুটোই বৃদ্ধি পেতে পারে। পাঠকরাই সংবাদপত্রের প্রাণ। শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আনতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই ধরনের সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে পাঠকদের সমর্থনই সবচেয়ে বড় শক্তি।