বাচ্চাদের খাবারের রুচি বাড়ানোর উপায় | শিশুর অরুচি কেন হয় ও করণীয়

প্রকাশিত: ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২৬

বর্তমান সময়ে বাবা-মায়েদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার একটি হলো বাচ্চা ঠিকমতো খেতে চায় না। কেউ ভাত খেতে চায় না, কেউ সবজি দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আবার কেউ সারাদিনে সামান্য কিছু খেলেই পেট ভরে গেছে বলে জানায়। শিশুর এই খাবারে অরুচি বিষয়টি এখন শুধু পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

শিশুর খাবারে রুচি না থাকলে তার শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ভবিষ্যতে নানা জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। তাই সময় থাকতেই বাচ্চাদের খাবারের রুচি বাড়ানোর উপায় জানা ও তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি।

শিশুর খাবারে অরুচি কেন হয়?

শিশুর খাবারে অরুচির পেছনে সাধারণত তিন ধরনের কারণ কাজ করে—

  1. অপুষ্টিজনিত কারণ

  2. খাবার খাওয়ার অভ্যাসগত কারণ

  3. অসুস্থতাজনিত কারণ

চলুন একে একে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুর খাবারে অরুচি

জিংকের ঘাটতি

শিশুর শরীরে জিংকের অভাব হলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুধা কমে যায়।
জিংক সমৃদ্ধ খাবার:
মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলিজা, বাদাম।

ভিটামিন বি-১২ এর অভাব

ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতিতে শিশুরা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খাবারের প্রতি আগ্রহ হারায়।
উৎস: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও রঙিন শাকসবজি।

ভিটামিন সি ও ডি এর অভাব

ভিটামিন সি ক্ষুধা বাড়াতে সাহায্য করে এবং ভিটামিন ডি শারীরিক বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার:
আমলকি, লেবু, কমলা, টমেটো, গাজর, ব্রকলি।

অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার অভাব

প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার অভাবে খাবারের পুষ্টি ঠিকমতো শোষিত হয় না।
প্রোবায়োটিক খাবার: টক দই, ঘোল, পান্তাভাত।

 লাইসিন অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতি

লাইসিন হজমশক্তি বাড়ায় ও ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে।
উৎস: চাল ও ডাল মিশিয়ে রান্না করা খিচুড়ি।

২. খাবার খাওয়ার অভ্যাসগত কারণে অরুচি

  • একটি খাবার না খেলে সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প খাবার দেওয়া

  • রাতে দেরি করে ঘুমানো

  • প্রতিদিন একই ধরনের একঘেয়ে খাবার

  • মোবাইল বা টিভি দেখে খাওয়ানো

  • অতিরিক্ত বাইরের খাবার (চিপস, চকলেট, কোল্ড ড্রিংকস)

এই অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে শিশুর খাবারের রুচি নষ্ট করে দেয়।

৩. অসুস্থতাজনিত কারণে শিশুর অরুচি

  • পেটের সমস্যা (গ্যাস, অ্যাসিডিটি, কোষ্ঠকাঠিন্য)

  • জ্বর, সর্দি-কাশি বা সংক্রমণ

  • কৃমির সংক্রমণ

  • কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (যেমন অ্যান্টিবায়োটিক)

বিশেষ করে কৃমির সংক্রমণ শিশুর ক্ষুধামন্দার অন্যতম বড় কারণ। তাই নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত জরুরি।

খাবারের মাধ্যমে বাচ্চাদের রুচি বাড়ানোর উপায়

✔ ভিটামিন সি ও জিংক সমৃদ্ধ খাবার দিন

লেবু, আমলকি, টমেটো, গাজর, কমলা, মাছ, মাংস, ডিম।

✔ প্রোটিন ও ফ্যাট যুক্ত করুন

ডিম, মাছ, নরম করে রান্না করা মাংস, দুধ, পনির, ঘি ও মাখন।

✔ আদা ও তুলসীর রস

খাবারের সাথে অল্প পরিমাণ আদা ও তুলসীর রস দিলে হজম ভালো হয় ও রুচি বাড়ে।

✔ খাবারে বৈচিত্র্য আনুন

  • সবজি দিয়ে খিচুড়ি

  • ডিম ও সবজি দিয়ে ফ্রাইড রাইস

  • আলুর পরোটা

  • রঙিন প্লেটে খাবার পরিবেশন

✔ হালকা মশলা ব্যবহার করুন

মরিচ এড়িয়ে হিং, দারুচিনি ব্যবহার করলে পাচনতন্ত্র ভালো থাকে।

অভ্যাসের মাধ্যমে শিশুর খাবারের রুচি বাড়ান

  • বাইরের প্রক্রিয়াজাত খাবার বন্ধ করুন

  • ছোট ও ঘন ঘন খাবার দিন

  • খাওয়ানোর সময় গল্প, ছড়া বা মজার কথা বলুন

  • জোর করে খাওয়াবেন না

  • নিয়মিত খেলাধুলা করান

  • খাবারের একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন

শিশুর খাবারে অরুচির লক্ষণ

  • খাবার দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া

  • জোর করলেও মুখ না খোলা

  • অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া

  • ওজন না বাড়া বা কমে যাওয়া

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যান—

  • ৭ দিনের বেশি অরুচি

  • নিয়মিত ওজন কমে যাওয়া

  • বমি, জ্বর, ডায়রিয়া

  • শিশুর দুর্বল ও উদাসীন হয়ে পড়া

শিশুর অবস্থা গুরুতর হলে ঘরোয়া উপায়ে না থেকে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

উপসংহার

শিশুর খাবারে অরুচি অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। সঠিক খাবার, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ এই তিনটির সমন্বয়েই সম্ভব বাচ্চাদের খাবারের রুচি বাড়ানো। আজ থেকেই সচেতন হলে আপনার শিশুর সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

Facebook Comments Box