সাবস্টেশন না থাকায় অচল হয়ে আছে বিদ্যুতের ৭টি প্রধান সঞ্চালন লাইন

জান্নাত জান্নাত

রিপোর্টার

প্রকাশিত: ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২৬

সাবস্টেশন নির্মাণে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয়ে থাকা অন্তত সাতটি বড় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এখনো পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় সাবস্টেশন না থাকায় সেগুলোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল মিলছে না, অন্যদিকে গ্রাহকরাও প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বরিশাল-ভোলা-বোরহানউদ্দিন ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন এর একটি বড় উদাহরণ। লাইনটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও ২৩০ কেভি ক্ষমতার সাবস্টেশন না থাকায় এটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় রয়েছে। ২০২২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পিজিসিবি সাবস্টেশন নির্মাণের জন্য চুক্তি করলেও নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সঞ্চালন লাইনটি এখনো দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীর ডোমার-হাতিবান্ধা এবং ডোমার-পূর্বশহর এলাকায়। এসব এলাকায় ১৩২ কেভি ক্ষমতার দুটি সাবস্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও কাজ শেষ হয়নি এখনো। ফলে ওই অঞ্চলে তৈরি হওয়া সঞ্চালন লাইনগুলো অলস পড়ে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত অসম্পূর্ণতার কারণে।
শুধু তাই নয়, শিবচর-গোপালগঞ্জ সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে। সেখানে সঞ্চালন লাইন সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকলেও সাবস্টেশন না থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাচ্ছে না। এতে করে জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারণ পরিকল্পনায়ও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে।
ভোলা, নীলফামারী, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে মোট সাতটি সাবস্টেশন নির্মাণের দায়িত্ব ২০২২ ও ২০২৩ সালে এনার্জিপ্যাক নামের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় আড়াই বছর। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে পিজিসিবি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে।
পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশীদ খান জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট এবং কাজের ধীরগতির কারণে প্রকল্পগুলো সময়মতো সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগিরই নতুন ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ঋণের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেগুলো থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষ ও শিল্পখাত। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো নিরাপত্তা ঝুঁকি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়া সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশনের যন্ত্রপাতি চোরচক্রের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। সম্প্রতি নাটোরের বড়াইগ্রামে একটি সাবস্টেশন থেকে পাহারাদারদের বেঁধে রেখে প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল লুটের ঘটনা এই ঝুঁকির বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক হলেও বাস্তবে এসব স্থাপনা পুরোপুরি নিরাপদ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পিজিসিবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর আগেও বিভিন্ন স্থানে চুরির ঘটনা ঘটেছে। পরে দ্রুত মালামাল সংগ্রহ করে পুনরায় স্থাপন করা হলেও এ ধরনের ঘটনা প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও সশস্ত্র চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, কেন এনার্জিপ্যাক নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিদ্যুৎ খাতে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ব্যাংকিং জটিলতা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা কাজ চালিয়ে যেতে পারেনি। বিশেষ করে একটি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে তারা জানিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহল এ ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, সাবস্টেশন নির্মাণে বিলম্বের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রস্তুত থাকা সঞ্চালন লাইনগুলো দ্রুত কাজে লাগাতে না পারলে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া আরও বিলম্বিত হবে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ শেষ করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে পিজিসিবি। তাদের আশা, দ্রুত কাজ সম্পন্ন হলে এসব সঞ্চালন লাইন চালু করে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

Facebook Comments Box