
১–২ বছর বয়স শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় সঠিক পুষ্টিকর খাবার না পেলে ভবিষ্যতে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। ভাত, ডাল, খিচুড়ি, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি ও পাকা ফল এই সব খাবার শিশুর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বুকের দুধের পাশাপাশি দিনে ৩ বেলা মূল খাবার ও ২ বেলা নাস্তা দিলে শিশু প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও পুষ্টি পায়। পাশাপাশি ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার শিশুর হাড় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।
শিশুর খাবার নিয়ে মায়েদের দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই ঠিকমতো খাচ্ছে তো? খাবারে কোনো ভুল হচ্ছে না তো? এই সব প্রশ্ন ঘুরপাক খায় প্রতিদিন। সঠিক দিকনির্দেশনা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পেলে এই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়। তাই শিশুদের বয়সভিত্তিক সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকা নিয়ে আমাদের এই আয়োজন, যাতে মা–বাবারা সহজেই বুঝতে পারেন কোন বয়সে শিশুকে কী খাওয়ানো সবচেয়ে ভালো।
১-২ বছর বয়সী শিশুদের খাবার নিয়ে মায়েদের প্রশ্নগুলো
১–২ বছর বয়সে শিশুর খাবার নিয়ে মায়েদের মনে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। এই বয়সে ঠিক কী কী খাবার দেওয়া নিরাপদ? বড়দের রান্না করা খাবার কি শিশুকে খাওয়ানো যাবে, নাকি আলাদা করে রান্না করা দরকার? দিনে কয়বার খাওয়ানো উচিত এবং প্রতিবার খাবারের পরিমাণই বা কতটুকু হওয়া উচিত? আবার প্রতিদিনের খাবারের রুটিন কেমন হলে শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো হয় এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মায়েরা প্রায়ই দুশ্চিন্তায় পড়েন।
এমন প্রশ্ন শুধু কয়েকটা নয়, রয়েছে আরও হাজারো ছোট-বড় জিজ্ঞাসা। এই লেখায় আমরা ১–২ বছর বয়সী শিশুদের খাবার নিয়ে একটি সহজ, বাস্তবসম্মত ও সামগ্রিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব, যাতে মা–বাবারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিশুর সঠিক পুষ্টির যত্ন নিতে পারেন।
১-২ বছরের শিশুর নমুনা খাবার তালিকা:
সকাল (৮–৯টা):
দিনের শুরুতে শিশুকে দিন পুষ্টিকর ও শক্তিদায়ক খাবার। একটি সিদ্ধ ডিম (কুসুমসহ) এর সঙ্গে সুজি, ওটস অথবা নরম রুটি দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আধা কাপ দুধ শিশুর ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণে সাহায্য করবে।
মিড-মর্নিং (১১টা):
এই সময় হালকা খাবার হিসেবে দিন চটকানো পাকা ফল। কলা, আম, পেঁপে বা আপেল শিশুর হজমের জন্য ভালো এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল সরবরাহ করে।
দুপুর (১–২টা):
দুপুরের খাবারে রাখুন নরম ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস অথবা কলিজা। সঙ্গে ডাল ও অল্প পরিমাণ শাকসবজি বা শাক দিলে শিশুর আয়রন ও প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ হয়।
বিকাল (৪–৫টা):
বিকেলের নাস্তা হিসেবে দিতে পারেন দই, সুজির হালুয়া অথবা ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর পুডিং। এগুলো শিশুর জন্য সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর।
রাত (৮–৯টা):
রাতের খাবারে দুপুরের মতোই ঘন খিচুড়ি অথবা নরম ভাত দিন। হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার রাতে শিশুর ঘুম ভালো হতে সাহায্য করে।
১–২ বছর বয়সী শিশুকে যেসব খাবার ও অভ্যাস এড়িয়ে চলা জরুরি
১–২ বছর বয়সে শিশুর হজমশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয় না। তাই এই সময় কিছু খাবার ও খাওয়ানোর অভ্যাস শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নিচে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো, যেগুলো মায়েদের অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত।
১. ফর্মুলা মিল্ক কখনোই রান্না করে খাওয়াবেন না।
ফর্মুলা দুধ রান্না করলে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায় এবং শিশুর পেটে সমস্যা হতে পারে।
২. কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলুন।
শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে আনার বা কাঁচা কলার মতো আয়রন জাতীয় খাবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উচিত।
৩. বাইরের খাবার সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন।
ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত বা রাস্তার খাবার শিশুর জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে।
৪. গরুর দুধ খাওয়াতে হলে পাতলা করে দিন।
যদি শিশুর গরুর দুধে অ্যালার্জি না থাকে, তাহলে অল্প পরিমাণে ও পানি মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
৫. কৌটাজাত ফুলক্রিম মিল্ক খাওয়ানো যাবে না।
এ ধরনের দুধ শিশুর হজমের জন্য ভারী এবং কিডনির ওপর চাপ ফেলতে পারে।
৬. তিন বছর বয়সের আগে আঙ্গুর দেবেন না।
আঙ্গুর গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই ৩ বছরের আগে এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
৭. নতুন খাবার খাওয়ানোর পর শিশুর শরীর লক্ষ্য করুন।
কোনো খাবার খাওয়ার পর পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া বা বমি হলে সেই খাবারটি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করুন।
৮. গলায় আটকে যেতে পারে এমন খাবার দেবেন না।
বাদাম, শক্ত ফলের টুকরা বা বড় দানার খাবার শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৯. অতিরিক্ত খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন।
জোর করে বা প্রয়োজনের বেশি খাওয়ানো শিশুর হজমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
১০. একদিনে অনেক ধরনের খাবার একসঙ্গে দেবেন না।
একই দিনে ডিম, দুধ, কলা, মাংস ও নানা ফল একসঙ্গে খাওয়ালে গ্যাস ও হজমের সমস্যা হতে পারে।
১১. পেটে গ্যাস হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখুন।
গ্যাস থাকলে আগে তা কমানোর ব্যবস্থা নিন, তারপর স্বাভাবিক খাবার দিন।
১২. শিশুর হাতে সবসময় পরিষ্কার খাবার দিন।
খাওয়ানোর আগে শিশুর হাত ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
১৩. শিশুর সামনে ক্ষতিকর খাবার খাবেন না।
এই বয়সে শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে। তার জন্য ক্ষতিকর খাবার শিশুর আড়ালে খাওয়াই ভালো।
১৪. শিশুর সামনে ওষুধ খেলে সাবধান থাকুন।
ওষুধ খাওয়ার পর অবশ্যই তা শিশুর নাগালের বাইরে রাখুন, যেন সে ভুল করে মুখে না দেয়।
পরামর্শ দিয়েছেন
ডাঃ রেজা আহমেদ
এমবিবিএস,বিসিএস (হেলথ), ডিসিএইচ, এফসিপিএস (শিশু),
এমডি (শিশু গ্যাস্ট্রোঃ) বিএসএমএমইউ (পিজি হাসপাতাল)
সিনিয়র কনসালটেন্ট ( শিশু)
২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য
এই খাবারের তালিকাটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ নির্দেশিকা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শিশুর রুচি, শারীরিক গঠন ও পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে, তাই শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারে পরিবর্তন আনা স্বাভাবিক। কোনো নির্দিষ্ট খাবারে সমস্যা দেখা দিলে তা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উচিত। এছাড়া যদি শিশুর কোনো বড় শারীরিক জটিলতা, অ্যালার্জি বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা থাকে, তাহলে অবশ্যই একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে খাবারের তালিকা নির্ধারণ করুন।


