সুখকর পরিণতিহীন শাসনব্যবস্থা চুক্তি: সীমিত সাফল্য নাকি ব্যর্থ রাজনৈতিক মডেল?

জান্নাত জান্নাত

রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১:১২ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০২৬

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শাসনব্যবস্থা চুক্তি বা গভর্ন্যান্স প্যাক্টকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বড় রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা জনসেবামূলক খাতের সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা বহুবার দেখা গেছে। তবে বাস্তবতায় এসব চুক্তির অনেকগুলোই প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কোথাও সীমিত সাফল্য মিলেছে, আবার কোথাও তা “ব্যর্থ মডেল” হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।
পর্তুগালের রাজনীতিতেও এমন অভিজ্ঞতা নতুন নয়। আন্তোনিও হোসে সেগুরোর সময়ের আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতে সমঝোতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্সেলো রেবেলো ডি সুসা ন্যায়বিচার, স্বাস্থ্যসেবা ও অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, জনগণের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে দলীয় বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত চুক্তি প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রচেষ্টাগুলো কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বল্পমেয়াদি ক্ষমতার হিসাব এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতা এসব চুক্তির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিরোধী দলগুলো অনেক সময় সরকারকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে অনাগ্রহী থাকে, আবার ক্ষমতাসীন দলও সমঝোতার বদলে একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। ফলে যে চুক্তিগুলো জনগণের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার আনতে পারত, সেগুলো মাঝপথেই থেমে যায় বা কার্যকারিতা হারায়।
পর্তুগালের স্বাস্থ্যখাতে সমঝোতার উদ্যোগ ছিল সবচেয়ে আলোচিত। হাসপাতালের দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসক সংকট এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে একটি জাতীয় সমঝোতা তৈরির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নীতিগত মতবিরোধের কারণে সেই পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পায়নি। একইভাবে ন্যায়বিচার খাতেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও দলীয় অবস্থানের সংঘাতের কারণে সংস্কারের গতি থেমে যায়।
অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। ভয়াবহ দাবানলের পর সরকার ও বিরোধী দলগুলো একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করলেও সময়ের সঙ্গে সেই ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগ মোকাবিলার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধারাবাহিক নীতি ও সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদল এসব উদ্যোগকে টেকসই হতে দেয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শাসনব্যবস্থা চুক্তি সফল করতে হলে শুধু কাগুজে সমঝোতা নয়, বরং বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতারা জনমত অর্জনের জন্য চুক্তির ঘোষণা দেন, কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন না। ফলে জনগণের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জোট রাজনীতি ও সমঝোতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে একক রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তে সমন্বিত নীতির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। তবুও রাজনৈতিক বিভাজন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে বহু দেশে শাসনব্যবস্থা চুক্তি কার্যকর ফল দিতে পারছে না।
পর্তুগালের অভিজ্ঞতা এখন ইউরোপের অন্যান্য দেশের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেউ এটিকে “সীমিত সাফল্যের মডেল” বলছেন, আবার কেউ “ব্যর্থ রাজনৈতিক পরীক্ষা” হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জাতীয় স্বার্থে টেকসই সংস্কার আনতে রাজনৈতিক ঐকমত্য অপরিহার্য হলেও, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, আন্তরিকতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ নেতৃত্ব।

Facebook Comments Box