
ইউরোপজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়তে থাকায় লিথিয়াম এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ সম্পদে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি পর্তুগালের তিনটি লিথিয়াম প্রকল্পকে “কৌশলগত প্রকল্প” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ইউরোপীয় কমিশনের অভ্যন্তরীণ নথি প্রকাশের পর নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো কারিগরি মূল্যায়নে সন্তোষজনক ফল না পেলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেগুলোকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ইইউর কারিগরি বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত ঝুঁকি, আর্থিক সক্ষমতা এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে একাধিক আপত্তি তুলেছিলেন। তবুও শেষ পর্যন্ত প্রকল্পগুলোকে কৌশলগত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সমালোচকদের দাবি, এটি ইউরোপীয় কমিশনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপ বর্তমানে চীননির্ভর ব্যাটারি ও খনিজ সরবরাহ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত লিথিয়ামের জন্য ইউরোপ এখন নিজস্ব উৎস তৈরিতে মরিয়া। আর সেই কারণেই পর্তুগালের মতো দেশগুলোর খনিজ প্রকল্পকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে ইইউ।
পর্তুগাল ইউরোপের অন্যতম সম্ভাবনাময় লিথিয়াম ভান্ডারের দেশ হিসেবে বিবেচিত। দেশটির উত্তরাঞ্চলে একাধিক খনি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো শুরু থেকেই এসব প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, লিথিয়াম উত্তোলনের ফলে বনভূমি ধ্বংস, পানিদূষণ এবং কৃষিজমির ক্ষতি হতে পারে।
এদিকে ইউরোপীয় কমিশনের ফাঁস হওয়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকটি প্রকল্পে পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছিল না। এছাড়া কিছু প্রকল্পের আর্থিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তবুও রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
যদিও পর্তুগাল সরকার এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সব প্রকল্পই ইইউর নীতিমালা মেনেই অনুমোদন পেয়েছে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনা ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের খনিজনীতি ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে আরও বড় বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ একদিকে ইউরোপ সবুজ জ্বালানির দিকে এগোতে চাইলেও অন্যদিকে খনিজ উত্তোলনের পরিবেশগত প্রভাবও ক্রমশ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
বিশ্ববাজারে বর্তমানে লিথিয়ামের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী দশকে এই চাহিদা আরও কয়েকগুণ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজস্ব খনিজ সম্পদ উন্নয়নের দিকে জোর দিচ্ছে। তবে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা না করে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে তা নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।


