
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় বৈশাখী ঝড়ের ভয়াবহ তাণ্ডবে বসতঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে এক মা ও তার দুই মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রোববার গভীর রাতে উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের দাগী গ্রামে হৃদয়বিদারক এ দুর্ঘটনা ঘটে। আকস্মিক এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুতে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের পরিবেশ।
নিহতরা হলেন দাগী গ্রামের মৃত গনি মন্ডলের স্ত্রী খুকি বেগম এবং তার দুই মেয়ে ফরিদা আক্তার ও ফতে আক্তার। স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিবারটি সাধারণভাবে বসবাস করলেও মা ও দুই মেয়ের মধ্যে ছিল গভীর স্নেহের বন্ধন। সেই পরিবারই মুহূর্তের মধ্যে ঝড়ে নিঃস্ব হয়ে গেল।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে খুকি বেগম ও তার দুই মেয়ে নিজ ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় বৈশাখী ঝড় শুরু হয়। প্রবল বাতাস, বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়ায় চারপাশের গাছপালা কাঁপতে থাকে। একপর্যায়ে ঘরের পাশে থাকা কয়েকটি বড় গাছ উপড়ে গিয়ে সরাসরি তাদের টিনের ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে ঘরটি মুহূর্তেই ধসে যায় এবং ভেতরে থাকা তিনজন গাছের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে ঝড়ের তীব্রতার কারণে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারেননি। ঝড়ের শব্দ আর বৃষ্টির কারণে দুর্ঘটনার বিষয়টি তখনই টের পাওয়া যায়নি। সোমবার ভোরে ঝড় থামার পর প্রতিবেশীরা ঘরটির ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা দেখে সন্দেহ করেন। পরে কাছে গিয়ে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তারা উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
পরে স্থানীয় লোকজন ও স্বজনদের সহায়তায় গাছের ডালপালা ও ভাঙা টিন সরিয়ে ঘরের ভেতর থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একসঙ্গে মা ও দুই মেয়ের নিথর দেহ দেখে সেখানে উপস্থিত মানুষজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। খবর দ্রুত পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় করেন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল আরা জানান, ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঘটনাটি জানার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
মেলান্দহ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির বলেন, নিহতদের মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করা হয়েছে। পরিবারের মতামত ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়রা আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়ের প্রকোপ বেড়েছে। ঝড়ের সময় দুর্বল ঘরবাড়ি ও পুরোনো গাছপালা বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণ ও দুর্যোগের সময় মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুতে দাগী গ্রামে শোকের মাতম চলছে। স্বজনরা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। প্রতিবেশীরা বলছেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনা তারা আগে দেখেননি। বৈশাখী ঝড়ের এক রাতেই একটি পরিবারে নেমে এসেছে অপূরণীয় ক্ষতি।


