বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে আইনে কী বলা আছে

জান্নাত জান্নাত

রিপোর্টার

প্রকাশিত: ৩:৫০ অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকা সত্ত্বেও তার নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা অনেককে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩।
বাংলাদেশের এই আইনে সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় যত্নের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি কোনো পরিবারের একাধিক সন্তান থাকে, তাহলে তারা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব ভাগ করে নেবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, সন্তানদের উচিত পিতা-মাতার সঙ্গে একই স্থানে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করা। কোনো সন্তান তার বাবা-মাকে তাদের সম্মতির বাইরে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোনো স্থানে থাকতে বাধ্য করতে পারবে না। পাশাপাশি নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করাও সন্তানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
যেসব ক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে না থেকে আলাদাভাবে বসবাস করেন, সেক্ষেত্রেও সন্তানদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আইন অনুযায়ী, তাদের নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করতে হবে এবং আর্থিকভাবে সহায়তা দিতে হবে। সন্তানের আয়-রোজগারের সামর্থ্য অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের জন্য নিয়মিত প্রদান করতে হবে।
শুধু পিতা-মাতাই নয়, প্রয়োজনে দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণপোষণের বিষয়েও আইনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের দেখভাল ও আর্থিক সহায়তার দায়িত্বও পরিবারের সদস্যদের ওপর বর্তায়।
আইনের বিধান অমান্য করলে শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। কোনো সন্তান যদি বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
এছাড়া কোনো ব্যক্তি—যেমন সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, সন্তান বা নিকট আত্মীয়—যদি বাবা-মা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণপোষণে বাধা সৃষ্টি করেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তাকেও একই ধরনের অপরাধে সহায়তাকারী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে।
আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য। অর্থাৎ অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিতে পারে, আবার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতার সুযোগও রয়েছে।
বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শুধু নৈতিক নয়, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনেও তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। তাই তাদের ভরণপোষণ ও সম্মানজনক জীবনযাপন নিশ্চিত করা প্রতিটি সন্তানের সামাজিক ও আইনগত দায়িত্ব।

Facebook Comments Box