শিশু সুরক্ষা কমিশনের মামলার চাপ বাড়ছে, প্রথমবার সামনে এলো জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা

জান্নাত জান্নাত

রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১২:০৬ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২৬

দেশজুড়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করা শিশু সুরক্ষা কমিশনগুলো (সিপিসিজে) ক্রমবর্ধমান সংখ্যক জটিল মামলার মুখোমুখি হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কিত অভিযোগ ও তদন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক ভাঙন, অর্থনৈতিক চাপ এবং অনলাইন ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে শিশু নির্যাতন ও অবহেলার ঘটনা আগের তুলনায় আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালে দেশজুড়ে ৩০০টিরও বেশি শিশু সুরক্ষা কমিশন প্রায় ৯৫ হাজারের কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু সংক্রান্ত মামলা পর্যবেক্ষণ ও নিষ্পত্তি করেছে। চার বছরের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পারিবারিক অবহেলা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভিভাবকদের অমনোযোগ, মানসিক নির্যাতন, আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক সহিংসতার কারণে শিশুরা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসন এখনো অভিযোগ জানানোর প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে। তবে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে বেনামী অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ এখন শিশু নির্যাতনের বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি সচেতন হলেও ভয় ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকে পরিচয় প্রকাশ না করেই অভিযোগ করছেন।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে প্রথমবারের মতো “জোরপূর্বক বা বাল্যবিয়ে”কে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে এ ধরনের ৫৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। শিশু অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ বহু ঘটনা এখনো পরিবারের ভেতরেই চাপা পড়ে যায়। বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ অঞ্চলে মেয়েশিশুদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, জোরপূর্বক বিয়ে শিশুদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক সহিংসতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানসিক ট্রমার সম্ভাবনা বাড়ে। একই সঙ্গে শিশুর স্বাভাবিক শৈশব ও ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার পথও বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। অনলাইনে হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, যৌন শোষণ এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো ঘটনা শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবার, স্কুল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
শিশু সুরক্ষা কমিশনগুলো এখন শুধু অভিযোগ তদন্তেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা পরিবার পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় এবং আইনি সহায়তাও দিচ্ছে। তবে মামলার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় জনবল ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু অধিকারকর্মীরা সরকারকে শিশু সুরক্ষা খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক মূল্যবোধের উন্নয়ন এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তারা বলছেন, প্রতিটি শিশুর নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে এবং সেই দায়িত্ব সমাজের সবার।

Facebook Comments Box