
দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণশুনানির পর নতুন মূল্যহার চূড়ান্ত করা হতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে জুন মাস থেকেই কার্যকর হবে নতুন দাম। এতে বিদ্যুতের বিল বাড়ার পাশাপাশি সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ও আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদরা।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা, ডলারের উচ্চমূল্য এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নতুন করে অস্থির হয়ে ওঠে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। ডিজেল, অকটেন ও অন্যান্য জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারের প্রায় সব পণ্যের ওপর। একইসঙ্গে বোতলজাত এলপি গ্যাসের দামও কয়েক দফা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বেড়ে গেছে।
এমন বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছে। অনেকেই বলছেন, মাস শেষে সংসারের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেখানে আবার বিদ্যুতের বিল বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সেবার মানে তেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় এখনও লোডশেডিং, ভোল্টেজ ওঠানামা এবং অনিয়মিত সরবরাহের সমস্যা রয়েছে। ফলে জনগণের একাংশ মনে করছে, সেবার গুণগত উন্নয়ন ছাড়া শুধুমাত্র মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের পাইকারি, খুচরা এবং সঞ্চালন ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক ধাপে প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। এই প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গণশুনানির আয়োজন করেছে। শুনানিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা অধিকার সংগঠন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ নাগরিকদের মতামত নেওয়া হবে। এরপর কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন সংস্থা মূল্য সমন্বয়ের আবেদন করেছে। তিনি জানান, গণশুনানিতে পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে দ্রুত নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হবে। তার মতে, বর্তমান ব্যয় কাঠামো বিবেচনায় দাম সমন্বয় প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সরকারের দাবি, বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ২ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একইভাবে বর্তমান মূল্যহার বহাল থাকলে আগামী ২০২৬ সালে এই ঘাটতি আরও বেড়ে ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে ভর্তুকির চাপ কমাতে এবং বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে সরকার মূল্য সমন্বয়ের পথে হাঁটছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু গ্রাহকের মাসিক বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, পরিবহন ভাড়া, ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবা খাত—সবখানেই বাড়তি খরচ যুক্ত হবে। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তারা মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা আগের তুলনায় কমে গেছে। তাই হঠাৎ করে বড় আকারে মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, সরকার হয়তো পুরো ভর্তুকি বহন করতে পারছে না, কিন্তু মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। তার মতে, জনগণের ওপর চাপ কমাতে ধাপে ধাপে সমন্বয়, অপচয় কমানো এবং বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এদিকে, বিদ্যুতের লাইফলাইন সুবিধা নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা কম দামে বিদ্যুৎ সুবিধা পান। আগে এই সীমা ছিল ৫০ ইউনিট, পরে তা বাড়িয়ে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত করা হয়েছিল। তবে নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এখন থেকে মাসে সর্বোচ্চ ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীরাই কেবল লাইফলাইন সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ, ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করলেই গ্রাহকদের সাধারণ হারে বিল দিতে হবে। এতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই আগের তুলনায় বেশি বিলের মুখোমুখি হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে উৎপাদন খরচ কমানো, সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ, অব্যবহৃত কেন্দ্রের সক্ষমতা চার্জ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান ছাড়া ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুতের সম্ভাব্য নতুন মূল্যহার নিয়ে এখন উদ্বেগ ও আলোচনা দুই-ই চলছে। গণশুনানির পর কমিশনের সিদ্ধান্ত কী হয়, সেটির দিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের প্রায় ৫ কোটি গ্রাহক।


